মঙ্গলবার । ২৬শে মে, ২০২৬ । ১২ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

কোরবানির শিক্ষা, করণীয়-বর্জনীয়

প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউসুফ আলী

বিশ্ব মুসলিম উম্মার জন্য ঈদুল আযহা বা কোরবানির ঈদ দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। এই দিনটি আমাদেরকে বারবার মনে করিয়ে দেয় আল্লাহর প্রেমে আত্মোৎসর্গের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত-শিশু ঈসমাইল (আঃ) এর আত্মনিবেদন ও হযরত ইব্রাহিম (আঃ)-এর অতুলনীয় আনুগত্য।

মহান রবের সন্তুষ্টির জন্য পিতা-পুত্রের এমন আত্মত্যাগ মানব জাতির সামনে এক চিরন্তন আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তবে মনে রাখতে হবে, কোরবানি শুধু পশু জবাই, মাংস খাওয়া বা বিতরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং আল্লাহর পথে নিজের জান-মাল, শ্রম-ঘাম ও অর্জিত সম্পদ নিঃসংকোচে উৎসর্গ করার দৃপ্ত অঙ্গীকার-এর নামই প্রকৃত কোরবানি। এ মনোভাবই ঈদুল আযহার আসল শিক্ষা, আসল শক্তি।

ঈদের দিনে করণীয় আমল : ঈদ যেমন আনন্দ তেমনি ইবাদতও বটে।

হাদিসের কিতাব থেকে জানা যায়, ঈদুল আযহার দিনে করণীয় আমলসমূহের মধ্যে রয়েছে:
১. নিজ মহল্লার মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় করা।
২. মিসওয়াক করা।
৩. গোসল করা।
৪. খুশবু ব্যবহার করা।
৫. সামর্থ্য থাকলে কোরবানি করা।
৬. সাধ্যানুযায়ী উত্তম পোশাক পরিধান করা।
৭. খুশি ও আনন্দ প্রকাশ করা।
৮. ঈদের ময়দানে যাওয়ার পূর্বে কোনো কিছু না খাওয়া।
৯. কোরবানির গোশ্ত দিয়ে দিনের খানা শুরু করা।
১০. সামর্থ্য অনুযায়ী অধিক পরিমাণ দান-সদাকা করা।
১১. আগেভাগে ঈদগাহে যাওয়া।
১২. পায়ে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়া।
১৩. ঈদগাহে এক পথে যাওয়া এবং অপর পথে ফিরে আসা।
১৪. ঈদগাহে যাওয়ার সময় তাকবীরে তাশরীক পাঠ করা। তাকবীরে তাশরীক হলো, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার, ওয়ালিল্লাহিল হামদ।
১৫. ঈদুল আযহার দিনে ফজরের ফরজ নামাজের পরে ঈদের জামাত পর্যন্ত আর কোনো সুন্নত বা নফল নামাজ না পড়া।
১৬. ঈদের নামাজ ঈদগাহে পড়া সুন্নত। তবে যদি বৃষ্টি-বাদল হয় অথবা অন্য কোনো বৈধ কারণ থাকে, তাহলে মসজিদে আদায় করা যায়।

ঈদের দিনে বর্জনীয় বিষয় :
১. আতশবাজি ফোঁটানো।
২. অশ্লীলতা ও নাজায়েজ আমোদ-ফুর্তিতে লিপ্ত হওয়া।
৩. যেখানে সেখানে ময়লা আবর্জনা ফেলে পরিবেশ দূষণ করা।
৪. প্রতিযোগিতা ও লোক দেখানোর জন্য কোরবানির পশুকে প্রদর্শনী করা।
৫. বেপরোয়া গাড়ি চালানো।

কুরবানির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম-কানুন :
১. প্রত্যেক সুস্থ জ্ঞানের অধিকারী, পূর্ণ বয়স্ক এবং মুকীম (মুসাফির নয়) ব্যক্তির উপর কোরবানি ওয়াজিব যাদের কাছে ১০ জিলহজ্জ ফজর থেকে ১২ জিলহজ্জ সন্ধ্যা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নিসাব পরিমাণ মাল আছে।
২. কোরবানির গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়ত করা যাবে। এতে কোরবানি ও আকিকা দুটোই সহিহ হবে।
৩. নাবালক শিশু-কিশোর এবং তদ্রুপ যে সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
৪. শরীকদের কারো পুরো বা অধিকাংশ উপার্জন যদি হারাম হয় তাহলে কারো কোরবানি সহিহ হবে না। যদি কেউ আল্লাহ তায়ালার হুকুম পালনের উদ্দেশ্যে কোরবানি না করে শুধু গোশ্ত খাওয়ার নিয়ত করে কোরবানি করে তাহলে তার কোরবানি সহিহ হবে না। তাকে অংশীদার বানালে শরীকদের কারো কোরবানি হবে না। তাই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে শরিক নির্বাচন করতে হবে।
৫. কোরবানির ছুরি অত্যন্ত ধারালো হতে হবে যাতে পশুর বেশী কষ্ট না হয়। এক পশুর সামনে অন্য পশুকে জবাই করা যাবে না, এতে পশু ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। পশু সম্পূর্ণ না মরলে চামড়া ছিলা যাবে না। পশুকে জবাইয়ের আগে অনেকক্ষণ ধরে মাটিতে রেখে কষ্ট দেওয়া যাবে না।
৬. জবাইকারীকে পারিশ্রমিক দিতে হবে। পারিশ্রমিকের পরিবর্তে গোশ্ত দেওয়া যাবে না (বুখারি ও মুসলিম)। অবশ্য পূর্ণ পারিশ্রমিক দেওয়ার পর পূর্বচুক্তি ছাড়া হাদিয়া হিসাবে গোশ্ত বা তরকারি দেওয়া যাবে।
৭. অনেক সময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কেই নিজ নিজ জবাইয়ের আগে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ পড়তে হবে। যদি কোনো একজন না পড়ে তবে ওই কোরবানি সহিহ হবে না এবং জবাইকৃত পশুও হালাল হবে না।
৮. কোরবানির পশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়া উত্তম। বড় ধরনের খুঁত আছে এমন পশু দ্বারা কোরবানি করা ঠিক নয়। যেমন; যে পশু একেবারে খোঁড়া ও অন্ধ, অথবা যার শিং একেবারে গোড়া থেকে ভাঙা, মস্তিষ্ক বিকারগ্রস্ত ক্ষতিগ্রস্ত এমন পশু দ্বারা কোরবানি জায়েজ নয়।
৯. কোরবানির চামড়া কোরবানিদাতা নিজেও ব্যবহার করতে পারবে। তবে কেউ যদি নিজে ব্যবহার না করে বিক্রি করে তবে বিক্রিয়লব্ধ মূল্য পুরোটা সদকা করে দিতে হবে।

ইব্রাহিম (আঃ) আল্লাহর হুকুমে তার শিশু পুত্র ঈসমাইল (আঃ) কে কুরবানি দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিলেন। এর মধ্যে অনেক সূক্ষ্ম রহস্য নিহিত রয়েছে। তিনি শুধু সন্তানের গলায় ছুরি চালাননি, বরং প্রকৃতপক্ষে ছুরি চালিয়েছেন তার নিজস্ব প্রবৃত্তি ও ইচ্ছার বিরুদ্ধে। আর এটাই হলো : কোরবানির মূল নিয়ামক ও প্রাণশক্তি।

লেখক : অধ্যাপক, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রেলিয়া থেকে।

খুলনা গেজেট/এএজে




খুলনা গেজেটের app পেতে ক্লিক করুন